ইবনে রুশদ্, একজন বিশিষ্ট মুসলিম মনীষী…

ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ মুসলিম সভ্যতাকে বিশ্ব জনমনের স্মৃতিপট থেকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে উদ্দ্যেশ্যমূলক ভাবে বিশ্ব বিখ্যাত যেসকল মুসলিম মনীষীদের নামকে বিকৃত করে লিপিবদ্ধ করেছে, তাঁদের মধ্যে ইবনে রুশদ্ এর নাম অন্যতম। তারা অধিকাংশ মনীষীর নাম এমনভাবে বিকৃত করেছে যে, নাম দেখে বুঝার উপায় নেই উনি একজন খাঁটি মুসলমান এবং খোদা ভীরু ছিলেন।

ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ ইবনে রুশদ্ এর নাম বিকৃত করে ‘এভেরোস’ লিপিবদ্ধ করেছে। তাঁর প্রকৃত নাম আবুল ওয়ালিদ মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে রুশদ্।
১১২৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের কর্ডোভা নগরীতে একটি অভিজাত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ স্পেনের রাজনীতিতে বিশেষভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর পিতামহ ছিলেন কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি। এছাড়াও তিনি কর্ডোভা জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন এবং মালেকি মাজহাবের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিতও ছিলেন৷

ইবনে রুশদ্ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান আধ্যাত্মবাদী। কথায় ও কাজে ছিলেন আল্লাহ পাকের অনুগত বান্দা। বাল্য ও কৈশোরে তিনি কর্ডোভা নগরীতে শিক্ষাগ্রহণ করেন৷ জ্ঞান সাধনার প্রতি তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ। তাঁর মেধা ও প্রতিভার বলে খুব কম সময়ের মধ্যেই কোরআন, হাদিস, বিজ্ঞান, আইন ও চিকিৎসায় তাঁর পাণ্ডিত্য ও কর্ম দক্ষতার সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর চিকিৎসার খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে মুগ্ধ হয়ে খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ ১১৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে তোফায়েলের মৃত্যুর পর তাঁকে রাজ চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করেন এবং পরবর্তীতে ইয়াকুবের পুত্র খলিফা ইয়াকুব আল মনসুরও ইবনে রুশদ্ কে রাজ চিকিৎসক পদে বহাল রাখেন। এরূপ রাজকীয় পদমর্যাদা আর প্রভাব প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই মহান মনীষী ভোগ বিলাসের মধ্যে ডুবে যাননি।

সরকারি বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি জীবনের সমস্ত অবসর সময়ে মানুষের কল্যাণে জ্ঞান সাধনা, দর্শন, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করতেন। কথিত আছে, তিনি বিবাহ ও পিতার মৃত্যুর রাত্রি ব্যতীত আর কোন রাত্রিতেই অধ্যয়ন ত্যাগ করেননি।

ইবনে রুশদ্ কখনো অন্যায় ও অসত্যের সামনে সত্য ও ন্যায়কে প্রকাশ করতে ভয় করতেন না৷ তিনি তাঁর দর্শনও ধর্মীয় বিষয়ে বলিষ্ঠ মতবাদ পোষণ করতেন। এতে কখনো কখনো খলিফারা তাঁর নির্ভীক ও স্পষ্ট মতবাদে বিরক্ত ও ক্রোধান্বিত হয়ে উঠতেন। অপরদিকে খ্রিস্টান পাদ্রীরা প্রচার করেন, “তাঁর নাম পাপের প্রতিশব্দ।”
অবশেষে খলিফা ইয়াকুব আল মনসুর তাঁকে প্রধান বিচারপতি’র পদ থেকে অপসারণ করেন। এতেও খলিফা সন্তুষ্ট হলেন না৷
খলিফা তাঁকে কর্ডোভার নিকটবর্তী ইলিসাস নামক স্থানে নির্বাসন দেন এবং তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান, অংকশাস্ত্র, পদার্থ বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ইবনে রুশদ্ চরম অপমান ও আর্থিক দূরাবস্থায় পতিত হন৷

১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে খলিফা তাঁর ভুল বুঝতে পেরে লোক পাঠিয়ে ইবনে রুশদ্ কে ফিরিয়ে আনেন এবং পূর্ব পদে পুনর্বহাল করেন। কিন্তু তিনি এ সুযোগ বেশিদিন ব্যবহার করতে পারেননি৷ ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে এ মুসলিম মনীষী ইহলোক ত্যাগ করেন৷

এই মহান মনীষী দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, আইন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ব্যাকরণ, চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে বহুগ্রন্থ রচনা করে যান৷ কিন্তু তাঁর প্রণীত অনেক গ্রন্থই সংরক্ষণের অভাবে আজ বিলুপ্ত প্রায়। তাঁর প্রণীত প্রায় ৮৭টা বই এখনো পাওয়া যায়নি৷ তিনি গোলকের গতি সম্বন্ধে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম ‘কিতাবু ফি হারকালু ফালাক’। গ্রন্থটি জ্যাকব আনাতোলি কতৃক ১২৩১ সালে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়৷ চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০টি। এগুলোর অধিকাংশই ইংরেজি, ল্যাটিন ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top